ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস আজ, পাঁচ দশকেও পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় হয়নি
প্রকাশ : 2026-05-16 10:47:32১ | অনলাইন সংস্করণ
নিউজ ডেস্ক
আজ ১৬ মে, ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস। গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবিতে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৭৬ সালের এই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক লংমার্চ। সেই লংমার্চে কঠোর বার্তা দেন মওলানা ভাসানী। তার এই লংমার্চ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে ভারত। ফারাক্কার বিষয়ে সমঝোতায় আসার প্রতিশ্রুতি দেয় দেশটি। সেই থেকে দিনটি (১৬ মে) ফারাক্কা দিবস নামে পরিচিতি লাভ করে।
সেই ঘটনার পাঁচ দশক পার হলেও বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত পানির ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত এমন অভিযোগ পানি বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের।
ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর থেকে পদ্মা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। একসময় যে নদী ছিল খরস্রোতা, এখন শুষ্ক মৌসুমে তার বিশাল অংশ জুড়ে দেখা যায় বালুচর। কোথাও কোথাও নৌযানের বদলে চলাচল করছে ইঞ্জিনচালিত যানবাহন। অতীত ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব হারাতে বসেছে খরস্রোতা নদীটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, সেচ, মৎস্যসম্পদ ও নৌপথ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পদ্মা অববাহিকার লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মধ্যে পড়েছে।
১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ভারত পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু করে। এর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ভাটির দেশ বাংলাদেশে পানিপ্রবাহ কমতে শুরু করলে ভয়াবহ ভূ-প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে অর্ধেক হয়ে যায়। একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষি, সেচ, মৎস্য, পণ্য পরিবহণ ও নৌচলাচলে গভীর সংকট দেখা দেয়। পদ্মা অববাহিকার প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ব্যাপক সংকটে পড়ে। শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু মরুভূমিতে পরিণত হয় পদ্মার উজানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ভাটিতে ফরিদপুর পর্যন্ত ১৯৬ কিলোমিটার নদী অববাহিকা।
ফারাক্কার মরণঘাতী এই প্রভাব দেখে চুপ করে বসে থাকতে পারেননি মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চের ডাক দেন মওলানা। পরিস্থিতির প্রতিবাদে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহী থেকে ফারাক্কার উদ্দেশ্যে লংমার্চের ডাক দেন মওলানা ভাসানী। সেদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অগণিত মানুষ তার ডাকে সাড়া দেন। লাখো মানুষের অংশগ্রহণে সেই কর্মসূচি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ভারতবিরোধী ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে প্রতিবাদী জনতার ঢল নামে। এখান থেকেই ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চ শুরু হয়। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া লংমার্চ দুপুরে গোদাগাড়ীর প্রেমতলীতে পৌঁছে। পরে সন্ধ্যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ কলেজ মাঠে যাত্রাবিরতি করা হয়। পরদিন সকালে আবারও যাত্রা শুরু হয়ে সীমান্তবর্তী কানসাট হাইস্কুল মাঠে গিয়ে শেষ হয়।
কানসাটে অনুষ্ঠিত বিশাল সমাবেশে দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ অংশ নেন। ঐতিহাসিক ওই সমাবেশে মওলানা ভাসানী ফারাক্কা বাঁধকে “মরণবাঁধ” আখ্যা দেন। তার বক্তব্যে সমবেত জনতা প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে এবং “ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও মরণবাঁধ ফারাক্কা” স্লোগানে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়। সমাবেশে মওলানা ভাসানী বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ জাতির প্রতিবাদের এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে কানসাটে। তার এই আন্দোলন দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে ফারাক্কা ইস্যু। এরপর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ভারত পরে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। পানির দাবিতে পৃথিবীর ইতিহাসে এটি ছিল এক অবিস্মরণীয় প্রতিবাদের ঘটনা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই লংমার্চের পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ভারত গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে দুই দেশের মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের ইতিহাস: যেভাবে শুরু হয় গঙ্গার পানি সংকট
গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘদিনের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ফারাক্কা বাঁধ। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ভারত গঙ্গা নদীর ওপর এই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়। সে সময় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এর তীব্র বিরোধিতা করলেও ভারত জানায়, প্রকল্পটি তখনো প্রাথমিক অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে গঙ্গার পানিবণ্টন ইস্যুতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। তবে আলোচনা চলাকালেই ১৯৬১ সালে ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগেই, ১৯৭০ সালের মধ্যে মূল বাঁধ নির্মাণের কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়ে যায়।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কা এলাকায় নির্মিত এই বাঁধটি বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে অবস্থিত। প্রায় ২ হাজার ২৪০ মিটার দীর্ঘ এ বাঁধ নির্মাণে সে সময় প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয় এবং এতে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ভারত পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু করে। প্রথমে মাত্র ৪১ দিনের জন্য ভাগীরথী নদীর ফিডার ক্যানেলে পানি প্রবাহের কথা বলা হলেও পরবর্তীতে সেই ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ নেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এরপর থেকেই বাংলাদেশের গঙ্গা ও পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ কমতে শুরু করে, যা দেশের কৃষি, নদী, নৌপথ ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে। তবে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সীমিত পরিমাণ পানি পেলেও পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে বিতর্ক এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
ফারাক্কা চুক্তির পরও মেলেনি গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা
গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একাধিক চুক্তি হলেও এখনো পানির ন্যায্য হিস্যা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই শুষ্ক মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ পানি না পাওয়ায় দেশের নদী, কৃষি ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আন্তর্জাতিক চাপ ও দক্ষিণ এশিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ১৯৭৭ সালে ভারত বাংলাদেশকে নিয়ে গঙ্গার পানিপ্রবাহ বণ্টনে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছিল।
চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, এপ্রিলের শেষ ১০ দিনে ফারাক্কা পয়েন্টে প্রায় ৫৫ হাজার কিউসেক পানির মধ্যে বাংলাদেশ পাবে ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক এবং ভারত পাবে ২০ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি। এছাড়া পানির প্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশ তার নির্ধারিত অংশের অন্তত ৮০ শতাংশ পানি পাবে এমন গ্যারান্টিও রাখা হয়েছিল। পাঁচ বছর মেয়াদি এ চুক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছিল। তবে ১৯৮২ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে বাংলাদেশ নবায়নের আগ্রহ দেখালেও ভারতের আপত্তিতে তা আর সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে একই বছরের ৭ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। সেখানে আগের কিছু শর্ত বহাল থাকলেও বাংলাদেশের জন্য ৮০ শতাংশ পানি পাওয়ার গ্যারান্টি বাতিল করা হয়। ফলে পানিবণ্টনে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি। এদিকে ১৯৭৯ সালে নেপালকে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ নদী কমিশন গঠনের যে পরিকল্পনা ছিল, সেটিও পরবর্তী সমঝোতায় বাদ পড়ে যায়। এতে আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য সমাধানের পথ সংকুচিত হয় বলে মনে করা হয়। পরে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন গঙ্গা পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে, যা নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গবেষকদের দাবি, ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশের বহু নদী শুকিয়ে গেছে, সেচ সংকট বেড়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ইলিশসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছের প্রজাতি কমে গেছে। তারা আরও জানান, শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় নদীপথ অকার্যকর হয়ে পড়ছে এবং কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এদিকে ফারাক্কা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন আলোচনা সভা, সমাবেশ ও স্মরণ কর্মসূচির আয়োজন করেছে। ঢাকাসহ রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জেও দিবসটি ঘিরে নানা কর্মসূচি পালিত হবে।