গোয়ালীমান্দ্রায় মাদকের রাজত্ব: মাদকের বিষে নীল লৌহজং

প্রকাশ : 2026-05-08 07:50:59১ |  অনলাইন সংস্করণ

  নিউজ ডেস্ক   

গোয়ালীমান্দ্রায় মাদকের রাজত্ব: মাদকের বিষে নীল লৌহজং

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার গোয়ালীমান্দ্রা এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই মাদকের এক বিশাল অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিলের মরণনেশায় পুরো লৌহজংয়ের যুবসমাজ আজ ধ্বংসের মুখে। এলাকাবাসীর অভিযোগ—স্থানীয় প্রভাবশালী 'গডফাদার' এবং প্রশাসনের একটি অংশের পরোক্ষ মদদ ও নির্লিপ্ততা ছাড়া জনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় বছরের পর বছর এমন অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

যৌথ বাহিনীর অভিযান ও বর্তমান চিত্র

মাদকের এই করাল গ্রাস রুখতে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন মাঝে মাঝেই যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: নেছার উদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত বড় অভিযানে ১৮ জন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার এবং বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, মূল হোতারা প্রায়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এই সিন্ডিকেট কতটা বেপরোয়া তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ রাতে; গোয়ালীমান্দ্রা বাজারে চিহ্নিত মাদক কারবারি মাহমুদ ও তার বাহিনীর সদস্যরা মাদকবিরোধী অভিযানে আসা ডিবি পুলিশের ওপর সরাসরি হামলা চালায়, যাতে ৩ জন সদস্য গুরুতর আহত হন।

মাদকের বিষে নীল জনপদ: বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়

মাদকের বিষে আজ নীল হয়ে উঠছে পুরো লৌহজং। ঘরে ঘরে এখন অশান্তি আর মা-বাবার হাহাকার। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তরুণেরা চুরি, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ছে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ দেখা যায় ২০২৬ সালের এপ্রিলে, যখন হাট ভোগদিয়া গ্রামে মাদকের টাকা না পেয়ে মারুফ (ছদ্মনাম) নামে এক যুবক আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এই একটি ঘটনাই বলে দেয় মাদকের করাল গ্রাস কতটা গভীরে পৌঁছেছে এবং সমাজ কতটা পচে গেছে।

মুন্সীগঞ্জের মাদক সম্রাট ও গডফাদারদের তালিকা

বিভিন্ন সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ১,৬২০ জন মাদকের গডফাদার সক্রিয় রয়েছেন। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জ জেলাতেও বেশ কয়েকজনের নাম প্রশাসনের তালিকায় রয়েছে। তবে কোন এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তালিকা থাকা সত্বেও এসব গডফাদারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।

শীর্ষ কারবারি ও প্রভাবশালী যোগসূত্র: 

মুন্সীগঞ্জ সদরের পারুলপাড়া এলাকা থেকে আ. জব্বর ওরফে বাবু (৪২) এবং গোয়ালীমান্দ্রা এলাকা থেকে জিমি (৩৫) এর মতো মাদক কারবারিরা বারবার গ্রেপ্তার হয়েছে, যাদের অনেকের সাথেই প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। 

গোয়ালীমান্দ্রার ত্রাস মাহমুদ বাহিনী

গোয়ালীমান্দ্রার মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে মাহমুদ-এর নাম আলোচনায় আসে। ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ ডিবির ওপর হামলার মূল হোতা হিসেবে তাকে চিহ্নিত করা হয়। এলাকাবাসীর দাবি, সে স্থানীয়ভাবে বড় একটি গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রশাসনের গতিবিধি নজরদারি করতে নিজস্ব লোক ব্যবহার করে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গোয়ালীমান্দ্রার মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক মাহমুদের কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক পদ-পদবি না থাকলেও তার ক্ষমতার উৎস হলো স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সাথে গভীর সখ্যতা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, চিহ্নিত কারবারিরা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বা প্রভাবশালীদের আশেপাশে থেকে এক ধরনের ‘অদৃশ্য সুরক্ষা’ পায়। এই আশ্রয়ের কারণেই কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা করার দুঃসাহস দেখায় এবং গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই কারবার শুরু করে।

পারিবারিক সিন্ডিকেট: 

শুধু পুরুষ নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী পরিবারের নারীরাও এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। যেমন, কুমারভোগ এলাকার ইতি আক্তার ও কাকলী আক্তার-এর মতো ব্যক্তিদের নামও ইয়াবা ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়েছে।

সিন্ডিকেটের কাজের ধরণ: নজরদারি প্রযুক্তি 

গডফাদাররা সাধারণত নিজেরা সরাসরি মাদক বহন করে না। তারা সিসিটিভি ক্যামেরা বা নির্দিষ্ট 'সোর্স' বা 'লাইনম্যান' ব্যবহার করে প্রশাসনের মুভমেন্ট পর্যবেক্ষণ করে।

অর্থায়ন ও রাজনৈতিক ঢাল: 

এরা মূলত ব্যবসার মূল অর্থ যোগান দেয়। প্রশাসনের তালিকায় এদের ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে অপরাধীদের আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা দেয়। 

প্রশাসনের তালিকা ও সীমাবদ্ধতা

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (DNC) তথ্যানুযায়ী, অনেক সময় সঠিক তথ্যের অভাবে বা রাজনৈতিক চাপের কারণে আসল গডফাদারদের তালিকায় আনা সম্ভব হয় না।

প্রশাসনের ভাষ্য ও জিরো টলারেন্স

মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মোঃ মেনহাজুল আলম পিপিএম জেলার সকল ইউনিটের ইনচার্জদের মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। জেলা ডিবি পুলিশের ওসি ইশতিয়াক আশফাক রাসেল নিশ্চিত করেছেন যে, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। উপজেলা প্রশাসনও মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—অভিযানের খবর আগেভাগেই ফাঁস হয় কীভাবে এবং কেন রাঘববোয়ালরা সব সময় জালের বাইরে থেকে যায়?

লৌহজংকে মাদকমুক্ত করতে হলে কেবল খুচরা বিক্রেতা ধরলে হবে না, বরং মাদকের মূল উৎস এবং এর পেছনে থাকা গডফাদারদের মূলোৎপাটন করতে হবে। 

 প্রশ্ন রইল—

* চিহ্নিত কারবারি ও পুলিশের ওপর হামলাকারী মাহমুদ এখনো কার আশ্রয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে বিচরণ করছে?

* অভিযানের তথ্য কি প্রশাসনের ভেতর থেকেই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে? অন্যথায় মাদক স্পটে যাওয়ার আগেই অপরাধীরা পালিয়ে যায় কীভাবে?

* মাদকের খুচরা বিক্রেতারা ধরা পড়লেও, তাদের পেছনে অর্থ যোগান দেওয়া ‘গডফাদাররা’ কেন বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে?

* রাজনৈতিক দলগুলো কি তাদের পদ-পদবি ব্যবহার করে মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনার লাইসেন্স দিচ্ছে?

* প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা কি কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ, নাকি মাঠ পর্যায়ে এর প্রকৃত বাস্তবায়ন আমরা দেখব? 

চিহ্নিত অপরাধীরা কার শক্তিতে আইনের রক্ষকদের ওপর আঘাত করার সাহস পায়? 

চলবে ...