বরগুনার পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহকদের দুর্ভোগের অবসান কবে?

প্রকাশ : 2026-06-09 14:26:02১ |  অনলাইন সংস্করণ

  নিউজ ডেস্ক   

বরগুনার পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহকদের দুর্ভোগের অবসান কবে?

উপকূলীয় জেলা বরগুনায় পল্লী বিদ্যুৎ সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি যেনো কমছেই না। তাদের  দীর্ঘদিনের একটি বড় অভিযোগ হলো- জেলার বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের তুলনায় এখানে এখনো পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গড়ে ওঠেনি। ফলে নতুন সংযোগ, মিটার পরিবর্তন, বিল সংশোধন, অভিযোগ নিষ্পত্তি কিংবা বিভিন্ন কারিগরি সমস্যার সমাধানে সাধারণ গ্রাহকদের নানামুখী ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বরগুনায় পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন একটি জোনাল অফিস কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ১৯৯৫ সাল থেকে এই অফিসের মাধ্যমে জেলার গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে সময়ের সঙ্গে গ্রাহক সংখ্যা ও সেবার পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলেও প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জনবল সেই অনুপাতে বাড়েনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
 
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা স্থানীয় পর্যায়ে সীমিত থাকায় নানা বিষয়ে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্য পটুয়াখালীতে যোগাযোগ করতে হয়। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হয়, অন্যদিকে গ্রাহকদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ও করতে হয়। বিশেষ করে জেলার দূরবর্তী উপজেলা ও চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।
 
বরগুনা সদর উপজেলার একাধিক গ্রাহক জানান, বিদ্যুৎ বিলের অসঙ্গতি, মিটার বিকল হওয়া কিংবা নতুন সংযোগের আবেদন নিয়ে অফিসে বারবার ঘুরতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সমাধান না পাওয়ায় সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ট্রান্সফরমার বিকল বা লাইনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলেও সমাধানে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
 
এ বিষয়ে বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর মো. সালেহ বলেন, 'বরগুনা একটি স্বতন্ত্র জেলা হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যুৎ সেবার ক্ষেত্রে এখনো পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামোর অভাব রয়েছে। একটি জেলার লাখো গ্রাহককে শুধুমাত্র জোনাল অফিসের মাধ্যমে সেবা দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। পূর্ণাঙ্গ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বা অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন জোনাল কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে গ্রাহক হয়রানি অনেকাংশে কমে আসবে এবং সেবার মানও বৃদ্ধি পাবে।'
 
জেলা পর্যটন শিল্প উদ্যোক্তা সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ বলেন, 'বরগুনা পর্যটনের সম্ভাবনাময় জেলা। এখানে নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পর্যটন কেন্দ্র ও শিল্প উদ্যোগ গড়ে উঠছে। কিন্তু বিদ্যুৎ সংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় বাধা। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে বরগুনায় একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি।'
 
এদিকে বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মনির হোসেন কামাল বলেন, 'বিদ্যুৎ এখন মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অন্যতম অংশ। কিন্তু গ্রাহকদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়া, বিল সংক্রান্ত জটিলতা এবং বিভিন্ন সেবায় দীর্ঘসূত্রতা জনভোগান্তি বাড়াচ্ছে। বরগুনার মতো একটি জেলার জন্য পৃথক ও শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো অত্যন্ত জরুরি। এতে জনগণ দ্রুত সেবা পাবে এবং জবাবদিহিতাও বৃদ্ধি পাবে।'
 
সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ সেবার মান, বিল সংক্রান্ত অনিয়ম এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ধীরগতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ দেখা গেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও এসব বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন জেলার সাধারণ মানুষের অন্যতম আলোচিত সমস্যা হয়ে উঠেছে।
 
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পল্লী বিদ্যুৎ বরগুনা জোনাল অফিসের ডিজিএম নাজমুল ইসলাম বলেন, 'আমরা সীমিত জনবল ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেও গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। বরগুনায় গ্রাহক সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, ফলে কাজের চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেসব বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন, সেগুলো নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগে। তারপরও গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি। ভবিষ্যতে জনবল ও অবকাঠামো বৃদ্ধি পেলে সেবার মান আরও উন্নত হবে।'
 
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, বরগুনার ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে এখানে পূর্ণাঙ্গ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি অথবা অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন স্বয়ংসম্পূর্ণ জোনাল কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এতে জেলার সব উপজেলা থেকে সহজে সেবা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে, অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
 
জেলার লাখো গ্রাহকের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং বরগুনাবাসী আধুনিক ও ঝামেলামুক্ত বিদ্যুৎ সেবা পাবে।