রমজানে পণ্য মজুতের অভিনব কৌশল: গুদাম এখন লাইটার জাহাজ

  শফিকুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৭ |  আপডেট  : ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৭

 

সামনে আসছে রমজান মাস, তার কয়েক দিন আগেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সাধারণত প্রতিবছর রমজান মাসে দেশে নিত্যপণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের সামঞ্জস্য না থাকলে বাজার অস্থির হয়, দাম বেড়ে যায় এবং ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এই পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চায় অসাধু ব্যবসায়ীরা। আর এ বছর রমজান এবং নির্বাচন কাছাকাছি সময়ে হওয়াতে পরিস্থিতি আরও নাজুক। নির্বাচন ও রোজা সামনে রেখে ইতোমধ্যে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফা আয়ের পরিকল্পনা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে এবারের পণ্য মজুতের কৌশল কিছুটা ভিন্ন। স্থলভিত্তিক গুদামের পরিবর্তে, নারায়ণগঞ্জ, যশোর ও নোয়াপাড়া এলাকার নদীতে ভাসমান লাইটার জাহাজে পণ্য রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছু আমদানিকারক পণ্য খালাস না করে দীর্ঘদিন জাহাজে আটকে রেখেছেন। এতে লাইটার জাহাজ কার্যত ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।


বিষয়টি ইতোমধ্যে সরকারেরও নজরে এসেছে। রমজান ও নির্বাচনের সময় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত না হওয়ার জন্য নৌপরিবহন অধিদফতর একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। টাস্কফোর্সের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত জাহাজে থাকা পণ্যের মালিক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাজার পরিস্থিতি

প্রতিবছর রমজান এলেই ছোলা, চিনি, ভোজ্যতেলসহ কিছু নিত্যপণ্যের চাহিদা বেশি থাকে। এ বছরও দাম বাড়ছে। রাজধানীর কাওরান বাজারের পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহে আপাতত কোনও সংকট নেই, তবু পাইকারি বাজারে ছোলা-চিনির দাম বাড়ছে। এতে খুচরা বাজারের ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

পাইকারি ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক বলেন, “আমদানিকারকরা পণ্য খালাস কমিয়ে রেখেছেন এবং লাইটার জাহাজে মজুত রেখেছেন। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। চাহিদা মোতাবেক সরবরাহ কম থাকলে পণ্যের দাম স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে।”

এদিকে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় মনে করছে, রমজান মাসকে সামনে রেখে আমদানিকারকরা একসঙ্গে অনেক বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে পণ্য আমদানি করেছেন। এর ফলে বহিঃনোঙরে বাণিজ্যিক জাহাজের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রবন্দর থেকে পণ্য খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় লাইটার জাহাজের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে আমদানি করা পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে, স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে নৌপরিবহন অধিদফতর কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

সরকারের পদক্ষেপ

নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক কমডোর মোহাম্মদ শফিউল বারী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, অভিযানের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ছয় সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এতে নৌপরিবহন অধিদফতর, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ ও অভ্যন্তরীণ নৌযান পরিদর্শন দফতরের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।

আইনগত প্রেক্ষাপট

দেশের বিদ্যমান খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণের বেশি খাদ্যদ্রব্য মজুত করা বা সরকারি নির্দেশনা অমান্য করা হলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে ২ থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড বা উভয় শাস্তি হতে পারে। এছাড়া, সরকারি গুদামে অবৈধভাবে পণ্য সরবরাহ বা মেয়াদ উত্তীর্ণ খাদ্যদ্রব্যের মিশ্রণও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

ব্যবসায়ীরা যা বলছেন

পণ্য মজুতের বিষয়ে জানতে চাইলে লাইটার জাহাজ মালিক সমিতির কর্মকর্তা তোফাজ্জেল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অভিযোগটি নতুন মনে হচ্ছে। এর আগে এমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ জাহাজের মালিক বিভিন্ন কোম্পানির এবং তারা প্রয়োজনের ক্ষেত্রে তাদের জাহাজে পণ্য রেখেছেন।”

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহার ভাষ্য, লাইটার জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে ১-২ দিনের বিলম্ব হতে পারে, এটি বড় কোনও সমস্যা নয়।

বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব

রমজান ও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে দাম আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ছোলা, চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম ইতোমধ্যে বেড়েছে। সরকার পদক্ষেপ না নিলে ভোক্তারা বিপর্যস্ত হতে পারেন।

সৌজন্যে বাংলা ট্রিবিউন

কা/আ 

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত