নববর্ষ ১৪৩৩ সবার জন্য হোক মঙ্গলময়
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
প্রকাশ: ৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:৩৩ | আপডেট : ৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:১১
বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলা নববর্ষ। পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ, চৈত্রের শেষ বৈশাখের শুরু। এই শেষ চৈত্র আর পয়লা বৈশাখ নিয়ে যে উৎসবের আয়োজন, তা বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। বাঙালির নতুন বছরের প্রথম দিন। মোগল সম্রাট আকবর তার শাসনামলে ফসলের খাজনা তোলার সুবিধার্থে বাংলা বছরের হিসাব শুরু করেন। সেই থেকে বাংলা নববর্ষবরণ শুরু হয়। পয়লা বৈশাখ ধর্মবর্ণ ভেদাভেদ ভুলে সব সম্প্রদায়ের এক মিলনের স্মারক।
বাঙালি জাতি সারাটা বছর অধীর আগ্রহে এই দিনের জন্য অপেক্ষা করে। পয়লা বৈশাখ প্রকৃতির নিয়মে ঘুরে আসে। এ বছর বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ নানা আয়োজনে বরণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা ডিজিটাল মাধ্যমে বর্ষবরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সাল থেকে নিয়মিত সূর্যোদয় থেকে রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখের প্রভাতি সংগীতায়োজন করে আসছে ছায়ানট। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে এবং করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে রমনার বটমূলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এ বছর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার রমনার বটমূলে নানা আয়োজনে বাংলা নববর্ষকে বরণ করা হবে। এছাড়া দেশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন আয়োজনে বর্ষবরণ হবে। নববর্ষ উৎসবে নানা আয়োজন দেশ-বিদেশে মানুষের জীবনকে নানাভাবে উজ্জীবিত ও আন্দোলিত করে। উৎসব আয়োজনে থাকে বৈশাখী মেলা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, পুতুলনাচ, জারিসারি, গানের আসর, লাঠিখেলা, নানা রকম পিঠাপুলির আয়োজন, অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তাভাত খাওয়ার আয়োজন করা হয়। এসব আনুষ্ঠানিকতা বাঙালিকে বিশ্বদরবারে পরিচিত ও সমৃদ্ধ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বের করা হয়, ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে জাতিসংঘের ইউনেসকো গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু গত বছর পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে বের হওয়া শোভাযাত্রার নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। তার আগে এটি ছিল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।
এই শোভাযাত্রা এখন থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে হবে বলে গত ৫ এপ্রিল (রবিবার) জানিয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে যে বিতর্ক, আমরা তার অবসান চাই। এখন থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হবে।’
তিনি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণসহ অন্যান্য সকল আয়োজন থাকবে। চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়, তার যে যে বৈশিষ্ট্য আছে, সবই থাকবে।’
বাঙালির জীবনে বাংলা নববর্ষ একটি সচেতন প্রতিফলন। প্রত্যেক জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি প্রভাব বিস্তার করে একটা সুস্থ ও সচেতন মানসগঠনের দায়িত্ব নেয়। সংস্কৃতির মধ্যে অবগাহন করেই মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বের স্পষ্ট একটি রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করে। নিজের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা যে কোনো জাতিকে বড় হওয়ার প্রাথমিক দীক্ষা দেয়।
মূলত বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি তার নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকে। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। সচেতন জাতির পরিচয় প্রকাশিত হয় বিচিত্র সাংস্কৃতিক রূপের মধ্য দিয়ে। বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির সেই পরিচয়বাহী। নববর্ষ মানুষকে সচেতন করে তার সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। জাতীয় জীবনে বর্ষবরণের প্রথম দিনে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর অর্থ নতুনকে বরণের সাগ্রহ মনোভাব। বাঙালি একটি ভাষাভিত্তিক জাতি। যাদের জন্ম বঙ্গে, মাতৃভাষা বাংলা, মূলত তারাই বাঙালি। এই বাঙালির বড় উৎসব বাংলা নববর্ষ। বিগত বছরের দুঃখ, বেদনা, আনন্দ, উৎসবের স্মৃতিচারণ পরিহার করে নতুন বর্ষকে স্বাগত জানানো হয়। বৈশাখে উৎসবে মানুষের ঢল নামে। মেলা বসে গ্রামে গ্রামে। নানা ধরনের হাতের তৈরি দ্রব্য ও খাবারের মেলা যেন গ্রামবাংলার মানুষের প্রতিচ্ছবি। তাদের জীবন যেন খণ্ড খণ্ড হয়ে ধরা পড়ে তাদের হাতের কারুকাজে। মাটির পুতুল, পাটের শিখা, তালপাতার পাখা, সোলার পাখি, বাঁশের বাঁশি, ঝিনুকের ঝাড়, পুঁতিমালা, কত না অদ্ভুত সব জিনিসের সমাবেশ ঘটে সেই মেলায়। চোখে না দেখলে যেন বিশ্বাসই হয় না বাংলার মানুষের জীবন এত সমৃদ্ধশালী। বাংলার মানুষ গরিব হতে পারে, দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে তারা জর্জরিত হতে পারে; কিন্তু এসব দুঃখকষ্ট তাদের জীবনকে আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। নববর্ষ বছরটির জন্য আশার বাণী বহন করে নিয়ে আসে। তাই নববর্ষ আমাদের প্রাণে জাগায় আশার আলো ও উদ্দীপনা।
এজন্য আমাদের কাছে পয়লা বৈশাখ, পারসিকদের কাছে নওরোজ এবং ইংরেজদের কাছে ঐধঢ়ঢ়ু ঘবি ণবধৎ বিশেষ আনন্দময় দিবস। বাঙালি জীবনে যেমন ছিল পুণ্যাহ অনুষ্ঠান, তেমনি হালখাতা অনুষ্ঠান। জমিদারি প্রথা বাতিলের সঙ্গে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান বিলুপ্ত হয়েছে; কিন্তু হালখাতা অনুষ্ঠান সগৌরবে বিরাজমান। নানা ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানে উদযাপিত হয় হালখাতা উৎসব। বিগত বছরের ধারদেনা শোধের পর্ব শুরু হয় এই দিনে। এর মধ্যে শুধু ব্যাবসায়িক লেনদেন নয়, হৃদয়ের বিনিময়ও ঘটে। ব্যবসায়িক লেনদেনের মধ্য দিয়ে পয়লা বৈশাখে মানুষে মানুষে সৌহার্দ বাড়ে। আজকাল পয়লা বৈশাখ উদযাপনের মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, বিশেষ করে নাগরিক জীবনে। শহরে শহরে মুক্তাঙ্গনে কবিতাপাঠ, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রভৃতি কর্মসূচি পালন করা হয়। ঢাকায় রমনার বটমূলে এই অনুষ্ঠান বিশেষ ব্যাপকতা লাভ করেছে। শুধু নাচগানই নয়, বাঙালির বহুকালের অভ্যাস পান্তাভাত ও ইলিশ ভাজা খাওয়া এখানে চালু আছে বহু বছর ধরে। বৈশাখের তথা বাংলা নববর্ষের চেতনা বাঙালির হৃদয়ে অন্তরে মিশে আছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, বাংলা নববর্ষের ব্যাবহারিক প্রয়োগ আমাদের জীবনে প্রায় অনুপস্থিত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা সন কিংবা বাংলা তারিখের ব্যবহার নেই বললেই চলে। বিদ্যালয়, অফিস-আদালত, ব্যাংক-বিমা, বিদেশভ্রমণের তারিখ নির্ধারণ ইত্যাদি কোনো পর্যায়েই বাংলা তারিখ ব্যবহৃত হয় না। পৃথিবীর বুকে একমাত্র যে দেশের মানুষ তাদের ভাষা রক্ষার জন্য আন্দোলন করে জীবন দিয়েছে, যে দেশে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ পালিত হয় জমজমাট পরিবেশে, আনন্দঘন উৎসবে, সে দেশেই বাংলা সন ও বাংলা তারিখ উপেক্ষিত! এই অবস্থায় পয়লা বৈশাখের চেতনা তথা বাঙালির সংস্কৃতি ও বাংলা সন-তারিখ আদালতসহ দেশের সর্বত্র চালু করা প্রয়োজন। সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ও বাংলা তারিখ ব্যবহার করা অপরিহার্য।
নববর্ষ নতুন নতুন বার্তা নিয়ে ফিরে আসে। পূর্বের ভুলভ্রান্তি, গ্লানি, পঙ্কিলতা, নানা অনাচার ধুয়েমুছে সুন্দর, সত্য ও কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে এবারের বৈশাখ, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ সবার জন্য হোক কল্যাণময়, আনন্দময় ও মঙ্গলময়।
লেখক পরিচিত:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত