পোস্টাল ব্যালটে ভোটের গোপনীয়তা নিয়ে সংশয়, ইসি বলছে 'নিরাপদ'
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০৪ | আপডেট : ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:১৫
প্রথমবারের মতো প্রবাসী ভোটার, দেশের ভেতরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কারাবন্দিদের জন্য পোস্টাল ব্যালটে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থাকে স্বাগত জানালেও ভোটের গোপনীয়তা নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। দীর্ঘদিন ধরে ভোটব্যবস্থায় আস্থার সংকট থাকায় অনেকেই আশঙ্কা করছেন—ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সময় তাদের পছন্দের প্রতীক গোপন থাকবে কি না।
প্রবাসী ও দেশের ভেতরে থাকা একাধিক ভোটার মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সময় ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করতে হয় এবং সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর উল্লেখ থাকে। একই সঙ্গে ঘোষণাপত্র ও ব্যালটে ক্রমিক নম্বর থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চাইলে ভোটার কোন প্রতীকে ভোট দিয়েছেন তা জানতে পারেন-এমন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, এই শঙ্কার কোনো ভিত্তি নেই। কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরো প্রক্রিয়ায় ভোটের গোপনীয়তা রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং ভোটারদের নির্ভয়ে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ওমান প্রবাসী মুনজুরুল তাপস জানান, ঘোষণাপত্রে এনআইডি নম্বর দিতে হয়েছে এবং ব্যালটের সঙ্গে একই ক্রমিক নম্বর থাকায় পরে তার মনে প্রশ্ন জেগেছে—তার ভোটের পছন্দ কেউ জেনে ফেলতে পারেন কি না।
একই দেশে থাকা মাসুদ নামের আরেক ভোটার বলেন, পোস্টাল ব্যালট ভালো উদ্যোগ হলেও গোপনীয়তা নিয়ে সংশয় আছে। “ভোট দিতে পেরে ভালো লেগেছে। কিন্তু রিটার্নিং কর্মকর্তা আমার ভোটটি দেখে ফেলবেন কিনা-এই ভয় কাজ করছে,” বলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী রীতা বলেন, দীর্ঘদিন পর ভোট দিতে পেরে আনন্দিত হলেও প্রক্রিয়াটি নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে। “আমার ভোটের তথ্য অন্য কেউ জানবে কিনা, সেটাই ভাবছি,” বলেন তিনি। একই দেশের আরেক প্রবাসী রনি বলেন, “ব্যালটের গোপনীয়তা নিশ্চিত না হলে আবারও আমরা আস্থাহীনতায় পিছিয়ে যাব।”
শুধু প্রবাসীরাই নন, দেশের ভেতরে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও একই ধরনের শঙ্কা রয়েছে। এক পুলিশ কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বলেন, ঘোষণাপত্রে এনআইডি নম্বর থাকায় তিনি কিছুটা চিন্তিত-তার ভোটের পছন্দ কেউ জানতে পারবে কি না।
ফেনীর ফুলগাজীর সরকারি স্কুলশিক্ষক ফিরোজ আহমেদ বলেন, প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ মনে হলেও ঘোষণাপত্রের বিষয়টি নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
পোস্টাল ব্যালটের গোপনীয়তা নিয়ে তৈরি হওয়া এই শঙ্কাকে “ভিত্তিহীন” বলে মনে করেন নির্বাচন কমিশনের ওসিভি ও আইসিপিভি প্রকল্প পরিচালক ড. সালীম আহমাদ খান। তিনি বলেন, বিগত ১৫ বছরের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর কারণে ভোটারদের মধ্যে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকেই এমন সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।
তার ভাষায়, “এই আস্থার সংকট কাটাতে আমাদের অন্তত কয়েকটি ভালো নির্বাচন প্রয়োজন। তবে পোস্টাল ব্যালটের যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ নিরাপদ। এখানে গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই।”
তিনি জানান, ভোট গণনার সময় প্রথমে ঘোষণাপত্র যাচাই করা হবে, কিন্তু তখন ব্যালট খাম খোলা হবে না। স্বাক্ষর মিলিয়ে ঘোষণাপত্র আলাদা করা হবে এবং পরে গণনার সময় ব্যালট ও ঘোষণাপত্রের মধ্যে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ পৃথকীকরণ করা হবে। গণনাস্থলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ থাকবে এবং ছবি তোলার সুযোগ থাকবে না।
ড. সালীম আহমাদ খান আরও বলেন, “রিটার্নিং কর্মকর্তা যদি খাম খুলে দেখে রাখতেন কে কোথায় ভোট দিয়েছেন, তাহলে দেশে এতদিনে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। বাস্তবে এ ধরনের সুযোগ নেই।”
ঘোষণাপত্রে থাকা ক্রমিক নম্বরের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তিনি জানান, কোনো ভোটার আদালতে গিয়ে দাবি করলে যে তার ভোট জাল হয়েছে, তখন যাচাই করার জন্যই একই ক্রমিক নম্বর রাখা হয়েছে। এই নম্বরগুলো র্যান্ডোমাইজড, কোনো নির্দিষ্ট আসন বা কেন্দ্রভিত্তিক নয়। আদালতের নির্দেশ পেলে তখনই কেবল নম্বর মিলিয়ে ব্যালট যাচাই করা সম্ভব।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসীদের পাঠানো প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার পোস্টাল ব্যালট ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২৪টি ব্যালট গ্রহণ করা হয়েছে।
পোস্টাল ভোট অ্যাপের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৪ লাখ ৮০ হাজার ৪১৬ জন প্রবাসী ভোট দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫২ জন ভোট দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের ডাকব্যবস্থায় ব্যালট জমা দিয়েছেন।
দেশের ভেতরেও নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, নিজ এলাকা থেকে দূরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী এবং কারাগারে থাকা ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটে ভোটের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ৬ লাখ ৬২ হাজার ১৯১ জন ভোটারের কাছে ব্যালট পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৪৭ জন ব্যালট সংগ্রহ করেছেন, ২ লাখ ১১ হাজার ১২২ জন ভোট দিয়েছেন এবং ১ লাখ ৬৮ হাজার ৫১৯ জন ডাকযোগে ব্যালট ফেরত পাঠিয়েছেন।
নতুন এই পদ্ধতি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে যেমন আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি গোপনীয়তা নিয়ে শঙ্কাও স্পষ্ট। ইসি বলছে, সময়ের সঙ্গে আস্থা ফিরবে-আর সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত