যুক্তরাজ্যে স্থায়ী আশ্রয়ের সুযোগ শেষ?
মুনজের আহমদ চৌধুরী, লন্ডন
প্রকাশ: ২ মার্চ ২০২৬, ১২:০৫ | আপডেট : ৩ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪৫
যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতিতে এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা হলো আজ সোমবার (২ মার্চ)। এর মাধ্যমে দেশটিতে শরণার্থীদের জন্য স্থায়ী আশ্রয়ের দীর্ঘকালীন অধ্যায়ের কার্যত সমাপ্তি ঘটলো। আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রিস্টোরিং অর্ডার অ্যান্ড কন্ট্রোল’ বা শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার কাঠামোর কার্যক্রম শুরু করেছেন। নতুন এই আইন অনুযায়ী, আজ থেকে যারা যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের অনুমতি পাবেন, তারা প্রাথমিকভাবে মাত্র ৩০ মাসের জন্য অস্থায়ী অবস্থানের সুযোগ পাবেন।
এতদিন শরণার্থীরা পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের আবেদনের সুযোগ পেতেন। তবে এখন থেকে সেই প্রথা বাতিল করে পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা ব্যবস্থা চালু করা হলো। এই পদ্ধতিতে যদি ব্রিটিশ সরকার মনে করে কোনও শরণার্থীর নিজ দেশ এখন নিরাপদ, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার সুরক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে।
‘নিরাপদ দেশ’ তালিকায় বাংলাদেশ: বিপাকে আশ্রয়প্রার্থীরা
এই নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের নতুন সমন্বয়। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশকে ‘নিরাপদ দেশ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। সেই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে যুক্তরাজ্য।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে যে সব বাংলাদেশির আশ্রয়ের আবেদন প্রক্রিয়াধীন, এই তালিকার কারণে তাদের জন্য সুরক্ষার প্রমাণ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এখন থেকে ধরে নেওয়া হবে, বাংলাদেশ একটি নিরাপদ দেশ। ফলে আবেদনকারীকে ব্যক্তিগতভাবে প্রমাণ করতে হবে, সাধারণ জনগণের বাইরে তিনি কেন বিশেষ ঝুঁকির সম্মুখীন। নতুন বর্ডার সিকিউরিটি, অ্যাসাইলাম অ্যান্ড ইমিগ্রেশন বিলের অধীনে এ ধরনের দেশ থেকে আসা আবেদনগুলো দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করা হবে; যার ফলে প্রত্যাখ্যানের হার এবং আপিলের কঠোরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
স্থায়ীত্বের জন্য ২০ বছরের অপেক্ষা
৩০ মাসের অস্থায়ী মেয়াদের বাইরেও হোম অফিস স্থায়ী বসবাসের নিয়মে বড় পরিবর্তন এনেছে। ‘কোর প্রোটেকশন’ রুটে থাকা ব্যক্তিদের স্থায়ীত্বের আবেদনের জন্য এখন ১০ বছরের পরিবর্তে ২০ বছর বসবাসের শর্ত পূরণ করতে হবে। এর অর্থ হলো, একজন শরণার্থীকে স্থায়ী বসবাসের আবেদনের যোগ্য হতে হলে দুই দশক ধরে অন্তত আটবার ‘নিরাপদ দেশ’ সংক্রান্ত পুনঃমূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হবে।
তবে ২ মার্চের আগে যারা আবেদন জমা দিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর হবে না। নতুন ‘প্রোটেকশন ওয়ার্ক অ্যান্ড স্টাডি’ রুটটিকে এই দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়ানোর একমাত্র উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই রুটে শরণার্থীরা কর্মসংস্থান-ভিত্তিক ভিসায় স্থানান্তরিত হতে পারবেন, যদিও এর জন্য ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং আর্থিক সচ্ছলতার মতো অত্যন্ত কঠিন কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
‘ডেনমার্ক মডেল’ ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসন
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কৌশলটি মূলত ‘ডেনমার্ক মডেল’ থেকে অনুপ্রাণিত, যেখানে কঠোর প্রত্যাবাসন নীতির মাধ্যমে আশ্রয়ের আবেদন ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে রিফিউজি কাউন্সিলসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, ১১ লাখের বেশি মামলার বারবার পর্যালোচনা করতে প্রশাসনিক খরচ৭২৫ মিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সরকারের দাবি, এখন এই প্রত্যাবাসন কার্যকর করার মতো লজিস্টিক সক্ষমতা রয়েছে হোম অফিসের। আগামী মে মাসে ‘কিংস স্পিচে’ মানবাধিকার সংক্রান্ত আপিলের ওপর আরও সীমাবদ্ধতা এবং ‘কন্ট্রিবিউশন-বেসড’ সুবিধা ব্যবস্থা প্রবর্তনের ঘোষণা আসতে পারে। এতে যারা নতুন একীভূতকরণ নিয়ম মানবেন না, তাদের জন্য সরকারি সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের আশ্রয় নীতি: সামনে আর কী পরিবর্তন অপেক্ষা করছে?
এ বিষয়ে লন্ডনের ল ম্যাট্রিক সলিসিটর্সের অন্যতম পার্টনার ব্যারিস্টার সালাহ উদ্দীন সুমন বলেন, গ্রীষ্মের আগেই আরও কিছু কঠোর পদক্ষেপ আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে নিরাপদ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর যুক্তরাজ্য এখন দ্রুততর আশ্রয় ব্যবস্থা কার্যকর করছে। ফলে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের সিদ্ধান্ত কয়েক মাসের বদলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চলে আসতে পারে। ব্যক্তিগত নির্যাতনের যথাযথ প্রমাণ ছাড়া সুরক্ষা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। মে মাসে প্রস্তাবিত নতুন বিলে ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের ৮ নম্বর ধারা (পারিবারিক জীবনের অধিকার) সীমিত করা হচ্ছে। এর ফলে ৩০ মাসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কেউ পারিবারিক কারণ দেখিয়ে নির্বাসন ঠেকাতে পারবেন না। এছাড়া ‘ওয়ান-স্টপ শপ’ আপিল ব্যবস্থার মাধ্যমে একবার আপিল খারিজ হলে সব আইনি পথ বন্ধ হয়ে যাবে এবং দ্রুততম সময়ে দেশত্যাগে বাধ্য করা হবে। ২০২৬ সালের শরৎকাল থেকে ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ বা অর্জিত স্থায়ীত্ব কাঠামো চালু হবে। এতে শরণার্থীদের ইংরেজি ভাষার দক্ষতা বি১ থেকে বাড়িয়ে বি২ লেভেলে উন্নীত করতে হবে এবং নিয়মিত ট্যাক্স বা ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স দেওয়ার প্রমাণ দিতে হবে। যারা ১২ মাসের বেশি সরকারি ভাতার ওপর নির্ভরশীল থাকবেন, তাদের স্থায়ী বসবাসের পথ ২০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে।
সৌজন্যে ঃ বাংলা ট্রিবিউন
কা/আ
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত