“দরিদ্রের ভূমি ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে সামাজিক ন্যায়বিচার অসম্ভব”

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:২১ |  আপডেট  : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৩২

বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন (BKF) এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর যৌথ উদ্যোগে  ২১ এপ্রিল ২০২৬, সকাল ১০টায় ঢাকা রিপোর্টারস ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে “দরিদ্রের ভূমি ন্যায়বিচার: আইনি উপকরণের মাধ্যমে অধিকার শক্তিশালীকরণ” শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি বদরুল আলম এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জায়েদ ইকবাল খান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ও উবিনিগের উপদেষ্টা ড. এম. এ. সোবহান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন উবিনিগের পরিচালক জাহাঙ্গির আলম জনি, কারিতাস বাংলাদেশের প্রতিনিধি বিকাশ বিশ্বাস, বিএএসডির পরিচালক মারকুস উজ্জ্বল কস্তা, বেলার আইনজীবী রুমানা শারমিন, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়নের সহ সাধারণ সম্পাদক খান রুস্তম আলী, মুক্ত আলোচনায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এএএম ফয়েজ হোসেন, বাংলাদেশ সংযুক্ত বিল্ডিং এন্ড উড ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক একেএম শহিদুল আলম ফারুক, বাংলাদেশ আদিবাসী সমিতির নেতা বিশ্বনাথ সিং,রাজশাহী জেলার অমলী কিসকু ও রাজশাহী জেলার প্রতিনিধি মোঃ হাসিনুর,গার্মেন্টস নেতা আল-আমিন, দুলাল হোসেন,পারভীন আক্তার, আরিফা আক্তার,রুপালী আক্তার,কক্সবাজার জেলার প্রতিনিধি কাজী রেনু,সাতক্ষীরা জেলার আঃ মান্নান, ফরিদপুর জেলার মোঃ হাসান,পটুয়াখালী জেলার ফেরদৌস হাওলাদার ও কুলসুম বেগম,ভোলা জেলার আঃ মালেক মেম্বার, বরিশাল জেলার  মিঠুন ঘরামি, মুন্সিগঞ্জ জেলার শেখ জোবায়ের,নারী নেত্রী রেহেনা বেগম, ঢাকা জেলার মনোয়ারা বেগম প্রমূখ। গণসংগঠন, কৃষক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ।

গোলটেবিল বৈঠকের মূল প্রবন্ধে দেশের ভূমিহীন, প্রান্তিক কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়নের সংকট গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয় যে, সংবিধান ও বিভিন্ন ভূমি আইন—যেমন State Acquisition and Tenancy Act, 1950, Land Reform Ordinance, 1984 এবং খাসজমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা—দরিদ্রবান্ধব কাঠামো প্রদান করলেও বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখলদারিত্বের কারণে।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, ভূমি প্রশ্ন কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। খাসজমি বণ্টনে অনিয়ম, ভূমি রেকর্ডের অস্পষ্টতা, বর্গাচাষিদের অনিরাপদ অবস্থান, নারীর উত্তরাধিকার বঞ্চনা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার সংকট—এসব সমস্যার সমাধানে কার্যকর আইনি সংস্কার ও প্রয়োগ অপরিহার্য।

বক্তারা আরও জোর দিয়ে বলেন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির বর্তমান বিচারব্যবস্থা দীর্ঘসূত্রিতা ও ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য তা কার্যত অপ্রবেশযোগ্য। এ প্রেক্ষাপটে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) প্রক্রিয়া জোরদার এবং বিশেষায়িত ভূমি ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

গোলটেবিল বৈঠক থেকে নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ প্রদান করা হয়—
ভূমি সিলিং আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ও অতিরিক্ত জমি উদ্ধার করে খাসজমি হিসেবে পুনর্বণ্টন
খাসজমি প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় বণ্টন
বর্গাচাষিদের লিখিত চুক্তি বাধ্যতামূলক ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা
ভূমি রেকর্ড ডিজিটালাইজেশন দ্রুত সম্পন্ন ও সহজলভ্য করা
ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিতে দ্রুত ও স্বল্পব্যয়ী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন
নারীর নামে ভূমি নিবন্ধনে প্রণোদনা এবং উত্তরাধিকার অধিকারে সমতা নিশ্চিত করা
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষায় পৃথক আইন প্রণয়ন
জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য কার্যকর ভূমি পুনর্বাসন নীতি প্রণয়ন
সভাপতির বক্তব্যে বদরুল আলম বলেন, “ভূমি শুধু একটি সম্পদ নয়—এটি মানুষের জীবিকা, মর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন। দরিদ্র মানুষের ভূমির অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রকৃত সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।”
বৈঠকে বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, আইনের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী সামাজিক ও গণআন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি, যাতে কৃষক, খেতমজুর, নারী, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হতে পারে।

গোলটেবিল বৈঠকটি ভূমি অধিকার ও আইনি ন্যায়বিচার বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করে এবং ভবিষ্যতে এ বিষয়ে যৌথ আন্দোলন, নীতি-সংলাপ ও গবেষণামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত