দুর্নীতি-চাঁদাবাজি কখনোই বন্ধ হবে না-কারণ রাষ্ট্র নয়, রাজনীতিই তার আশ্রয়

  মনিরুজ্জামান মনির

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫:০৪ |  আপডেট  : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:১১

বাংলাদেশে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নিয়ে মানুষ যে কথাটি সবচেয়ে বেশি বলে, সেটি শুনতে যতটা নিরাশাবাদী, বাস্তবতা তার চেয়েও নির্মম—দুর্নীতি কখনোই পুরোপুরি বন্ধ হবে না। সরকার বদলাবে, দল বদলাবে, মন্ত্রী বদলাবে, এমনকি স্লোগানও বদলাবে; কিন্তু দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির কৌশল বদলাবে না। কারণ দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু অসাধু ব্যক্তির কাজ নয়; এটি পরিণত হয়েছে ক্ষমতার অর্থনীতিতে। যেখানে রাজনীতি, প্রশাসন, ঠিকাদারি, ব্যবসা, মিডিয়া এবং আইন প্রয়োগকারী কাঠামোর একাংশ অদৃশ্যভাবে একই সুতোয় বাঁধা।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—রাষ্ট্র যখন দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিকে “স্বাভাবিক” ধরে নেয়, তখন তা শুধু বাড়ে না; বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও ভেঙে পড়ে। একসময় মানুষ মনে করে—এটাই নিয়ম। আর যেদিন কোনো জাতি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিকে নিয়ম হিসেবে মেনে নেয়, সেদিন সেই জাতির রাষ্ট্র কাগজে-কলমে রাষ্ট্র থাকলেও বাস্তবে পরিণত হয় ক্ষমতাবানদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে।

দুর্নীতির সমস্যাটি প্রশাসনে নয়—রাজনীতির ছায়ায় ঃ বাংলাদেশে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বহু আলোচনা হয়। বলা হয়—ডিজিটাল সেবা বাড়াতে হবে, প্রশাসনিক সংস্কার করতে হবে, দুর্নীতি বিরোধী কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে। এসব কথার গুরুত্ব অবশ্যই আছে। কিন্তু সত্য হলো—এগুলো অনেক সময় ভাসা নৌকার মতো; কারণ নৌকা ভাসবে না ডুববে, তা নির্ধারণ করে নদীর স্রোত। আর বাংলাদেশে দুর্নীতির স্রোত তৈরি করে রাজনীতি। এ দেশে অধিকাংশ বড় দুর্নীতি ঘটে প্রশাসনের ভেতরে নয়—প্রশাসনের মাথার ওপর থাকা রাজনৈতিক ছাতার নিচে। নিয়োগে বাণিজ্য, পদায়নে ঘুষ, বদলিতে কমিশন, প্রকল্পে কাটমানি, টেন্ডারে সিন্ডিকেট, সরকারি জমি দখল, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, বাজার নিয়ন্ত্রণে কারসাজি—সবখানেই দেখা যায় রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার। ফলে দুর্নীতি এখানে শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি রাজনৈতিক অস্ত্র, রাজনৈতিক সুবিধা, রাজনৈতিক পুরস্কার। এখানে দুর্নীতির সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হলো দলীয় পরিচয়। অপরাধের দায় অপরাধীর নয়; বরং নির্ধারিত হয় তিনি “কার লোক”। একজন সাধারণ নাগরিক সামান্য ভুল করলে আইন দ্রুত নেমে আসে। অথচ ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ কেউ বড় অনিয়ম করলেও রাষ্ট্র যেন অন্ধ, বধির, নির্বাক।

সরকার বদলালেও দুর্নীতি কেন বদলায় না? বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর জনগণের প্রত্যাশা প্রায় একই থাকে—এবার দুর্নীতি বন্ধ হবে, এবার টেন্ডার সিন্ডিকেট ভাঙবে, এবার নিয়োগ হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে, এবার প্রশাসন হবে জনবান্ধব। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই সেই প্রত্যাশা ভেঙে পড়ে। কারণ সরকার বদলায়, কিন্তু ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলায় না। এই দেশে ক্ষমতায় যাওয়া অনেকের কাছে রাষ্ট্রসেবা নয়—রাষ্ট্র দখল। ক্ষমতা মানে দায়িত্ব নয়—সুযোগ। সুযোগ মানে উন্নয়ন নয়—লুট। আর লুট মানে শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; দলীয় অর্থনীতির জ্বালানি। ফলে দুর্নীতি এখানে কেবল ব্যক্তির নৈতিক দুর্বলতা নয়; এটি দলীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখন কোনো দল ক্ষমতায় যায়, অনেক ক্ষেত্রেই তারা প্রশাসনকে দলীয় শাখায় পরিণত করে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে বানায় অনুগত বাহিনী। আর এই অনুগততার বিনিময়ে জন্ম নেয় “সুবিধাভোগী শ্রেণি”—যারা টেন্ডার, নিয়োগ, পদায়ন, লাইসেন্স, দখল ও কমিশন নিয়ন্ত্রণ করে। সবচেয়ে বড় সত্য হলো—দুর্নীতির বিরুদ্ধে যারা কথা বলে, তাদের অনেকেই ক্ষমতায় গেলে একই চক্রে জড়িয়ে পড়ে। কারণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায় না; শুধু চক্র বদলায়, সিন্ডিকেট বদলায়, ভাগ-বাটোয়ারার তালিকা বদলায়।

“বন্ধ হবে না” বললেই কি রাষ্ট্র দায়মুক্ত? একটি জাতি যদি দুর্নীতিকে অনিবার্য বলে মেনে নেয়, তাহলে তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায় নিজস্ব মনস্তত্ত্ব। মানুষ আর প্রতিবাদ করে না, প্রশ্ন তোলে না, দাবি জানায় না; শুধু টিকে থাকার কৌশল খোঁজে। এই মানসিকতা রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে। বাস্তবতা হলো—পৃথিবীর কোনো দেশই শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত নয়। কিন্তু বহু দেশ আছে, যেখানে মানুষ দুর্নীতি করতে ভয় পায়; যেখানে দুর্নীতি করলে শাস্তি নিশ্চিত; পদ যায়, সম্মান যায়, ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যায়। বাংলাদেশে সমস্যা হলো—দুর্নীতির খরচ কম, লাভ বেশি, আর নিরাপত্তা প্রায় নিশ্চিত। এই সমীকরণ বদলানোই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মূল শর্ত।

প্রথম শর্ত: দুর্নীতির রাজনৈতিক লাইসেন্স বন্ধ করতে হবেঃ বাংলাদেশে দুর্নীতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে তখনই, যখন এটি দলীয় বৈধতা পায়। টেন্ডার সিন্ডিকেট চলে “দলের লোক” দিয়ে, নিয়োগ বাণিজ্য চলে “নেতার আশীর্বাদে”, প্রকল্পে কাটমানি চলে “দলীয় খরচ” নামে। তখন দুর্নীতি আর অপরাধ থাকে না; হয়ে যায় “দল চালানোর খরচ”। কিন্তু প্রশ্ন হলো—দল চালানোর খরচ কি জনগণ বহন করবে? রাষ্ট্র কি দলীয় অফিস? সরকারি প্রকল্প কি দলীয় তহবিল? সরকারি চাকরি কি রাজনৈতিক পুরস্কার? এই প্রশ্নগুলোর সৎ উত্তর না দিলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের কোনো বাস্তব পথ তৈরি হবে না।

দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি-একটি কঠিন কিন্তু একমাত্র কার্যকর সূত্রঃ দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রশাসনের হাতে সীমিত; মূল ক্ষমতা রাজনীতির হাতে। প্রশাসন আইন প্রয়োগ করে, কিন্তু আইন প্রয়োগের স্বাধীনতা দেয় রাজনীতি। রাজনীতি যদি দুর্নীতিবাজকে রক্ষা করে, প্রশাসন কিছুই করতে পারে না। রাজনীতি যদি স্বচ্ছ হয়, তাহলে-টেন্ডার সিন্ডিকেট ভাঙা যায়, নিয়োগে ঘুষ বন্ধ করা যায়, বদলিতে কমিশন থামানো যায়, সরকারি জমি দখল রোধ করা যায় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারকে শাস্তির আওতায় আনা যায় অর্থাৎ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে হলে আগে রাজনীতিকে শুদ্ধ করতে হবে।

ডিজিটাল সেবা ও “নতুন” দুর্নীতিঃ ডিজিটাল সেবা দুর্নীতি কমাতে সহায়ক—এ কথা সত্য। কিন্তু এটি পূর্ণ সমাধান নয়। কারণ দুর্নীতির মূল শক্তি প্রযুক্তি নয়; মানসিকতা। আগে ঘুষ নেওয়া হতো কাউন্টারে, এখন নেওয়া হয় আড়ালে। আগে দালাল ছিল অফিসের সামনে, এখন সে ঢুকে গেছে অনলাইন নেটওয়ার্কে, সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণে, ঠিকাদারি প্ল্যাটফর্মে। প্রযুক্তি হাত বদলায়; কিন্তু মন বদলায় না।

দুর্নীতি বিরোধী প্রতিষ্ঠান কেন ব্যর্থ? বাংলাদেশে দুর্নীতি বিরোধী আইন আছে, প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে, তদন্ত সংস্থা আছে। তবু ফলাফল সীমিত। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা প্রায়ই রাজনৈতিক ইচ্ছার সীমারেখায় আবদ্ধ থাকে। ফলে অনেক সময় দুর্নীতি বিরোধী অভিযান হয় নির্বাচিত টার্গেটের বিরুদ্ধে, নীতিগতভাবে নয়। এতে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়—এটি কি সত্যিকারের দুর্নীতি বিরোধী পদক্ষেপ, নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের কৌশল? এই সন্দেহই লড়াইকে দুর্বল করে।

গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতিঃ দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর কাঠামো হলো জবাবদিহিতা। আর জবাবদিহিতার ভিত্তি কার্যকর গণতন্ত্র। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়; বরং—কার্যকর সংসদ, শক্তিশালী বিরোধী দল, স্বাধীন গণমাধ্যম, সক্রিয় নাগরিক সমাজ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, যেখানে এসব অনুপস্থিত, সেখানে দুর্নীতি ঝুঁকিহীন হয়ে ওঠে।

রাজনীতি শুদ্ধ না হলে রাষ্ট্র শুদ্ধ হবে নাঃ বাংলাদেশে দুর্নীতি হয়তো একদিনে নির্মূল হবে না—এটি বাস্তবতা। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভবও নয়। শর্ত একটাই—রাজনৈতিক নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে। আইনকে রাজনৈতিক ছাতার নিচ থেকে মুক্ত করতে হবে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সংকট আইন নেই—তা নয়। সংকট হলো, আইনের ওপরে রাজনৈতিক আশ্রয়। সেই আশ্রয় যতদিন থাকবে, দুর্নীতিবাজরা নিরাপদ থাকবে; জনগণ থাকবে বঞ্চিত। দুর্নীতি বন্ধ হবে না—এই বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকা রাষ্ট্রের কাজ নয়। রাষ্ট্রের কাজ হলো দুর্নীতির খরচ বাড়ানো, লাভ কমানো, শাস্তি নিশ্চিত করা, এবং রাজনৈতিক আশ্রয় ভেঙে দেওয়া। কারণ রাষ্ট্র যদি দুর্নীতির কাছে পরাজিত হয়, তবে তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়—নৈতিক বৈধতারও পতন। আর নৈতিক বৈধতা হারানো রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে ভয়, শক্তি ও দমননীতির ওপর—যার পরিণতি জাতির জন্য ভয়াবহ।

লেখক:
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সভাপতি, বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত