স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সাধারণ মানুষ
লৌহজংয়ে স্বাস্থ্যসেবার নামে ‘কসাইখানা’: লাইসেন্স নেই অধিকাংশেরই!
কাজী আরিফ
প্রকাশ: ৯ মে ২০২৬, ১৩:৫০ | আপডেট : ৯ মে ২০২৬, ১৭:২৯
মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অধিকাংশেরই নেই কোনো বৈধ লাইসেন্স। সরকারি নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন স্থানীয় রোগীরা। এসব প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে প্রতিনিয়ত ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র:
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লৌহজংয়ের প্রায় ৬২ শতাংশ বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানেরই বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স থাকলেও অধিকাংশেরই মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগে। মালির অংক বাজার, ঘৌড়দৌড় বাজার এবং চন্দ্রের বাড়ি বাজারের মতো জনবহুল এলাকায় অবস্থিত ফাইভ স্টার ক্লিনিক, পদ্মা ক্লিনিক, আফরোজা ক্লিনিক, সন্ধানী ক্লিনিক ও লাইফ এইড ক্লিনিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ দিন ধরে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের ভয়ংকর চিত্র:
উপজেলায় ৪টি বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১টির বৈধ লাইসেন্স রয়েছে। বাকি ৩টি হাসপাতাল বছরের পর বছর লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
ইউনুস খান মাহমুদ খানম মেমোরিয়াল হেলথ্ কমপ্লেক্স: গত ৪ বছর ধরে লাইসেন্স নেই।
ইসলামি জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার: ২ বছর ধরে লাইসেন্স ছাড়াই চলছে।
নওপাড়া ডিজিটাল হসপিটাল এন্ড দি ল্যাব: লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ২ বছর আগে।
ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। দক্ষ টেকনোলজিস্ট না থাকায় রোগীরা লাইসেন্সবিহীন এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায়ই ভুল রিপোর্টের শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়দের তথ্য মতে, ভুল রিপোর্টের কারণে ভুল চিকিৎসা নিয়ে সাধারণ রোগীরা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। এছাড়া, সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালদের মাধ্যমে রোগীদের ভাগিয়ে এসব ক্লিনিকে নিয়ে আসার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও অভিযান:
লৌহজং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফাহমিদা লস্করের সভাপতিত্বে সম্প্রতি এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করা হবে। লৌহজংয়ের এই নাজুক স্বাস্থ্যসেবা থেকে মুক্তি পেতে সাধারণ মানুষ নিয়মিত তদারকি এবং অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়ী বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
সেবার মান ও অবকাঠামো:
সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব ক্লিনিকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ডিপ্লোমা নার্স নেই। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছে অপারেশন থিয়েটার (OT) এবং প্যাথলজি ল্যাব। অনেক ক্ষেত্রে দক্ষ টেকনিশিয়ান ছাড়াই রোগ নির্ণয়ের রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে, যা ভুল চিকিৎসার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিভিল সার্জনের কঠোর হুঁশিয়ারি:
সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে জেলাজুড়ে অবৈধ ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS)-এর নির্দেশনায় সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেই বা নবায়ন করা হয়নি, তাদের কার্যক্রম দ্রুততম সময়ের মধ্যে বন্ধ করতে হবে। একইসাথে, অনিবন্ধিত কোনো ল্যাবে অপারেশন বা এনেস্থেসিয়া দেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হবে।
আইন কী বলে?
'দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২' মোতাবেক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিবন্ধন ছাড়া কোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া বর্তমান সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, লাইসেন্স না থাকলে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও যেকোনো মুহূর্তে প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু লৌহজংয়ে এই আইনের প্রয়োগ কেবল নামমাত্র অভিযানেই সীমাবদ্ধ। কোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বৈধ লাইসেন্স আছে কিনা সেটা জানতে স্বাস্থ্য বাতায়নের ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে নিশ্চিত হতে পারেন বা অভিযোগ জানাতে পারেন।
সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয় ও জেলা প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান এখন সময়ের দাবি। জনস্বার্থে লৌহজংয়ের এই অবৈধ ক্লিনিক বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত