সড়কের ওপর সাদা দাগ: হকার ‘পুনর্বাসন’ নাকি দখলদারিত্বের নতুন লাইসেন্স?
কাজী আরিফ
প্রকাশ: ৭ মে ২০২৬, ১৩:১০ | আপডেট : ৭ মে ২০২৬, ১৭:১৩
ঢাকাসড়কের প্রশস্ততা যেখানে এমনিতেই চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল, সেখানে রাস্তার ওপর সাদা দাগ টেনে হকারদের বসার জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়ার এক বিচিত্র উদ্যোগ নিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। রাজধানীর গুলিস্তান ও মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় এই দৃশ্য এখন নিয়মিত। সংস্থাটি একে ‘হকার ব্যবস্থাপনা’ বললেও, সাধারণ মানুষ এবং নগর বিশেষজ্ঞরা একে দেখছেন ফুটপাত ও সড়ক দখলের ‘প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা’ হিসেবে।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর বিভিন্ন ধারায় নিরাপদ ও যানজটমুক্ত সড়ক নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সড়কের ওপর কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা বা অননুমোদিত স্থাপনা নির্মাণ দণ্ডনীয় অপরাধ।
যেখানে একজন সাধারণ চালককে ‘নো-পার্কিং’-এর জন্য মোটা অঙ্কের জরিমানা গুণতে হয়, সেখানে রাস্তার ওপর দাগ কেটে হকার বসিয়ে রাখা ট্রাফিক আইনের প্রতি পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি একদিকে যেমন যানজট সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে যে, ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে হকার বসানোর নেপথ্যে কাজ করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এখন সিটি কর্পোরেশন নিজেই যখন জায়গা নির্দিষ্ট করে দিচ্ছে, তখন সেই সাদা দাগই চাঁদাবাজির নতুন ‘লাইন’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। সাধারণ হকারদের দাবি, তাদের কাছ থেকে ‘অফিস খরচ’ বা ‘ভর্তির’ নামে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই বরাদ্দ প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের হাতে চলে যাচ্ছে, ফলে চাঁদাবাজি বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে তা নতুন আঙ্গিকে সরকারি আশ্রয়ে চলার সুযোগ পাচ্ছে।
ঝুঁকিফুটপাত যখন হকারদের দখলে থাকে, পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটেন। আর যখন মূল রাস্তারও একটি অংশ সাদা দাগ দিয়ে হকারদের দেওয়া হয়, তখন পথচারীদের হাঁটার জায়গা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।নাগরিক মতামত: একজন ভুক্তভোগী পথচারী বলেন, “সিটি কর্পোরেশনের কাজ রাস্তা দখলমুক্ত রাখা, দখল করা নয়। এখন সাদা দাগের কারণে হকাররা নিজেদের সরকারি জায়গার মালিক মনে করছে।”
একজন মোটরযান মালিক বা সাধারণ নাগরিক যখন সড়কে গাড়ি চালান, তখন তিনি প্রতি বছর সরকারকে মোটা অঙ্কের মোটরযান কর এবং অগ্রিম আয়কর প্রদান করেন। এই কর প্রদানের মূল উদ্দেশ্য হলো নিরাপদ ও বাধাহীন চলাচলের সুবিধা লাভের জন্য। জনসাধারণের জন্য নির্ধারিত সড়কের ওপর সিটি কর্পোরেশন বা অন্য কোনো সংস্থার দোকান বসানোর বৈধতা দেওয়ার সুযোগ আইনিভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। সড়কের মালিক যেখানে সাধারণ জনগণ, সেখানে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ব্যবসায়িক স্বার্থে সেই জায়গা বরাদ্দ দেওয়া করদাতাদের অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, রাস্তার ওপর বসা কোনো সমাধান নয়। বরং হকারদের জন্য স্থায়ী হলিডে মার্কেট তৈরি করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় (যেমন সন্ধ্যা ৬টার পর) বা নির্দিষ্ট দিনে হকারদের জন্য পৃথক জোন ঘোষণা করা যেতে পারে। ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহার করে প্রকৃত হকারদের সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আনতে হবে, রাস্তা লিজ দিয়ে নয়।
রাস্তার ওপর সাদা দাগ টেনে হকার বসানো যানজট সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং এটি সমস্যাকে আড়াল করার একটি সাময়িক প্রচেষ্টা মাত্র। করদাতা নাগরিকদের অধিকার রক্ষা এবং একটি আধুনিক ও নিরাপদ নগরী গড়তে সড়ককে দখলমুক্ত রাখাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত