বাগেরহাটে জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় সভা
বাগেরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১৭:৫৭ | আপডেট : ২১ মে ২০২৬, ২২:০৪
বাগেরহাটে জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা (GBV) প্রতিরোধ ও মোকাবেলায় এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর ১১টায় জেলা পুলিশ সুপারের হল রুমে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) আয়োজনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোঃ আবু রাসেলের সভাপতিত্বে এবং ইউএনএফপিএ-এর বাগেরহাট ফিল্ড অফিসার ডা. নূর-ই-আলম সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় সভায় জেলার সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং পুলিশ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সভায় বক্তারা জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশের অগ্রগণ্য ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। বক্তারা বলেন, ভুক্তভোগী নারী বা শিশু যখন থানায় আসেন, তখন প্রথম স্পর্শবিন্দু বা 'ফার্স্ট কন্টাক্ট পয়েন্ট' হলো পুলিশ। তাই পুলিশকে শুরু থেকেই অত্যন্ত সংবেদনশীল আচরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে দেশের থানাগুলোতে স্থাপিত 'উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন ডেস্ক' গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে শুধু পুলিশের পক্ষে এককভাবে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সমাজসেবা অধিদপ্তর, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় আইনি সহায়তা প্রদান সংস্থা (NLASO) এবং বিভিন্ন এনজিও-কে একযোগে কাজ করতে হবে।
একটি সহিংসতাহীন সমাজ গঠনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সুদৃঢ় সমন্বয় ও সমন্বিত রেফারেল সিস্টেমের (Referral System) ওপর জোর দিয়ে সভায় বক্তারা বলেন, ভুক্তভোগী যখন কোনো ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (OCC) আসেন, তখন তার চিকিৎসার পাশাপাশি আইনি সহায়তা ও কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন হয়। এজন্য চিকিৎসা, আইনি ও পুলিশি সেবার মধ্যে একটি স্বয়ংক্রিয় এবং দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি এবং তথ্য আদান-প্রদানের সময় ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
সভায় ভুক্তভোগীদের আইনি, মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা, বিনামূল্যে সরকারি আইনি সহায়তা প্রদান, পেশাদার সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সেলিং এবং 'ভিকটিম ব্লেমিং' বা দোষারোপ বন্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়া হয়। এছাড়া ভুক্তভোগীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সভায় ৪ দফার একটি ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—
১. পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থার সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের জেন্ডার সংবেদনশীলতা বিষয়ক নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ প্রদান।
২. প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সাইবার ক্রাইম ইউনিটগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি।
৩. জেন্ডার সহিংসতা প্রতিরোধে পুরুষ এবং যুবসমাজকে সচেতনতা কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা।
৪. গ্রাম ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মনোয়ারা খানম, বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাঈদ শানু, জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা শেখ আসাদুর রহমান, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোস্তফা গিয়াস উদ্দিন, জেলা শিক্ষা অফিসের ডিস্ট্রিক্ট ট্রেনিং কোঅর্ডিনেটর এস এম হাবিবুর রহমান, বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারের প্যানেল লইয়ার মোঃ এস. এন. মনিরুজ্জামান, ব্র্যাকের জেলা সমন্বয়কারী মোহাম্মদ ইদ্রিস আলম, সুপ্তি মহিলা উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ঝিমি মন্ডল, বাঁধন মানব উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক এ এস এম মনজুরুল হাসান এবং বাদাবন সংঘের ডিস্ট্রিক্ট কোঅর্ডিনেটর সুরাইয়া আক্তার।
এছাড়াও সভায় বাগেরহাটের নয়টি উপজেলার অফিসার ইনচার্জগণ (ওসি) জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা রোধে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও করণীয় তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংহতি অপরিহার্য।
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত