প্রযুক্তির প্রভাবে

কাউনিয়ায় গ্রাম-বাংলা থেকে খড়ের গাঁদা বিলুপ্তির পথে

  সারওয়ার আলম মুকুল

প্রকাশ: ৮ মার্চ ২০২৬, ১৯:০৪ |  আপডেট  : ১০ মার্চ ২০২৬, ০১:১২

একটা সময় ছিল যখন রংপুরের কাউনিয়ায় গ্রামবাংলার প্রতিটি গ্রামে শুরু হতো গরুর গাড়ির চাকার ঘর্ষণ, রাখালের বাঁশির সুর আর শিশির ভেজা পথের শিউলি ফুলের সুবাসে। মাঠের সবুজ চাদরে ছেলেরা ছাগল গরু মহিষ চরাতে যেত, আর মাটির পথ ধরে হেঁটে যাওয়া কৃষকের মুখে থাকতো নতুন স্বপ্নের আলো আর লাঙ্গল-জোয়াল নিয়ে মাঠে যেতে গাইতো ভাওয়াইয়া গান। বিকেল হলেই উঠোনজুড়ে শুরু হতো শিশুদের হাসি-আনন্দের কোলাহল। মাঠের সোনালী ধান কেটে নিয়ে আসার পর গরু দিয়ে মারাই করে ধানের খড় গুলো গাদা করে রাখা হতো গো-খাদ্য ও ধান সিদ্ধ করার জন্য। কৃষি প্রযুক্তি, কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহার ও স্থান সংকটের কারণে গ্রাম-বাংলা থেকে ধানের খড়ের গাদা (পলের পালা) হারিয়ে যাচ্ছে। মাঠেই খড় বিক্রি এবং গো-খাদ্যের চাহিদা বাড়ায় এখন আর আগের মতো গৃহস্থবাড়ির আঙ্গিনায় খড় পালা করে রাখার দৃশ্য হারিয়ে যাচ্ছে।

সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে গৃহস্থ পরিবারগুলোর ঐতিহ্য ছিল খড়ের গাদা যা গৃহপালিত পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রত্যেক কৃষক পরিবারে পশু লালন পালন করা হতো। আর গরু-মহিষের খাবারের জন্য খড়ের গাদা রাখা হতো। বিয়ে সাধির ক্ষেত্রেও খড়ের গাদা দেখে পাত্রস্থ করা হতো। অথচ সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন শুধুই স্মৃতির পাতায় বন্দি। সেই সময়ে কৃষকদের ঘরে ঘরে খড়ের গাদা লক্ষ্য করা গেলেও বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য খড়ের গাদা। গরুর খামারির সংখ্যা বাড়তে থাকায় অনেক কৃষক পরিবার গরু মহিষ পালন করেন না। তারপরও কিছু কৃষক চাষাবাদের পাশাপাশি লালন পালন করা হয় গরুমহিষ। এসব পরিবারের উঠানে বা রাস্তার পাশে দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী খড়ের গাদা। কৃষক প্রহলাদ চন্দ্র জানান, যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান মাড়াইয়ের ফলে খড় ছোট টুকরো হয়ে যায়, যা গাদা দেওয়ার উপযোগী থাকে না এবং গ্রামে আধুনিকতার ছোঁয়া বিশেষ করে কলের লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষের ফলে ফলে খড়ের গাঁদার দৃশ্যগুলো এখন নেই বললেই চলে। কৃষক সিরাজুল জানান, আধুনিকায়ন, যান্ত্রিক চাষাবাদ এবং কাঁচাপাকা ঘরবাড়ির প্রসারের ফলে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খড়ের গাদা হারিয়ে যাচ্ছে। পুরাতন পদ্ধতির পরিবর্তে এখন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও পশুখাদ্যের ভিন্ন উৎসের কারণে গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে খড় সংরক্ষণের এই দৃশ্য এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। গদাই গ্রামের কৃষক মোঃ শাজাহান মন্ডল জানান, গৃহপালিত পশু গরুর খাবার হিসেবে মজুদ করে রাখা হয় ধানের শুকনো খড়। বিশেষ করে বর্ষাকালে গৃহপালিত পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেন কৃষকরা। শুকনো মৌসুমে গৃহপালিত পশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘাস, ভুষি ও অন্যান্য খবার খাওয়াতে পারলেও বর্ষাকালে গৃহপালিত পশুকে ঘাস কেটে খাওয়ানো অনেক সময় সম্ভব হয়না। তাই কৃষকরা আউশ, আমন, বোরো এই তিন মৌসুমে ধান কেটে ঘরে তুলে এবং পাকা ধান মাড়াইয়ের পর অবশিষ্ট খড়গুলো শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে স্তুপ করে রাখা হয়। যাকে খড়ের গাদা বলে। এখনো যদি কেউ সত্যিকারের গ্রামীণ পরিবেশ খুঁজতে চায়, তবে তাকে ফিরে যেতে হবে কয়েক দশক আগে, স্মৃতির পাতায়। নতুন প্রজন্মের কাছে সেই গল্প এখন শুধুই কল্পনা। যারা সেই সময়টা দেখেছেন, তাদের মনে আজও বাজে সেই রাখালের বাঁশির হারিয়ে যাওয়া সুর আর কৃষকের হাল চাষের শব্ধ কানে বাজে। 
 

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত